...
Updated: 15 Jan 2024
বিজ্ঞানের দর্শন ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি

আদিম যুগ থেকেই মানুষ প্রকৃতির রহস্য উন্মোচন করতে চেয়েছে, নতুন নতুন জ্ঞান লাভ করতে বছরের পর বছর ভ্রমণ করেছে দেশে বিদেশে, প্রাকৃতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে প্যাটার্ন খুঁজে বের করতে চেষ্টা করেছে। কিছু কিছু ভাবুক মানুষ যুগ যুগ ধরে প্রচলিত সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেছেন, স্বাধীনভাবে চিন্তা করেছেন, নতুন জ্ঞান লাভের অপরিসীম আগ্রহে পরিবার পরিজন, সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজের জীবন কে ল্যাবরেটরির গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ করে গবেষণায় নিবদ্ধ রেখেছেন। তাদের জ্ঞান অন্বেষণের বিশাল যজ্ঞ থেকে বের হয়ে এসেছে জ্ঞান অন্বেষণের বিভিন্ন পদ্ধতি, বিভিন্ন ধরণের দার্শনিক মতবাদ, বৈজ্ঞানিক সত্য এবং তত্ত্ব। প্রকৃতির সাথে লড়াইয়ে টিকে থাকার জন্য মানুষ তৈরি করেছে বিভিন্ন কলাকৌশল, যন্ত্রপাতি তথা প্রযুক্তি। যেসব মানুষেরা এসব তৈরিতে নিজেদের নিয়োজিত রেখেছেন, তারা বেশিরভাগ সময়ই সমাজের প্রচলিত ধারণা থেকে ভিন্নমত পোষণ করেছেন। সুনির্দিষ্ট, সুশৃঙ্খল ও কাঠামোবদ্ধ একটা পদ্ধতি শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে, যেটা পৃথিবীকে বদলে দিয়েছে, মানুষকে বদলে দিয়েছে, জীবনের সংজ্ঞা পাল্টে দিয়েছে, এমনকি মানুষের নৈতিকতার সংজ্ঞাও পরিবর্তন করে দিয়েছে। এটাই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি।

বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সারাংশ কয়েকটা উদাহরণ থেকে পরিষ্কার হবে।

১। গাছ থেকে ফল মাটিতে পড়ে। এটা একটা খুব সাধারণ পর্যবেক্ষণ। এটা যত মানুষ পৃথিবীর যে জায়গায় পর্যবেক্ষণ করুক একই ঘটনা পর্যবেক্ষণ করবে। তার মানে অনেক পর্যবেক্ষণে গাছ থেকে ফল ছিঁড়ে কোন দিকে যাবে, এই প্রাকৃতিক ঘটনার প্যাটার্ন জানা গেল। আমরা যদি একজন ধর্ম বিশারদ কে জিজ্ঞেস করি এটা কেন হয়, উনি উনার জ্ঞান অনুসারে হয়তো বলবেন এটা সৃষ্টিকর্তার কুদরতি বা কেউ কেউ হয়তো বলেই বসবেন এই বিষয়ে প্রশ্ন করা যাবে না। একজন বুড়ো গ্রাম্য মানুষ কে বললে হয়তো লাঠি নিয়ে তাড়াও করে বসতে পারেন, কেউ কেউ পাগল ও বলবে, এইসব ফালতু প্রশ্ন করার জন্য। কিন্তু সব মানুষ তো এইটুকুতে থামবে না।

প্রশ্ন হচ্ছে কেমন করে এটি সম্ভব হল? এই ঘটনাটি কোন কোন চলকের উপর নির্ভর করে এটা খুঁজে বের করলে আমরা ফাংশন বা সমীকরণের মাধ্যমে ঘটনাটির গাণিতিক রূপ বের করে আনতে পারি। এর জন্য দরকার পরীক্ষণ। চলক হিসেবে ফলের ভর, গাছের উচ্চতা, সময়, বল, বেগ, ত্বরণ ইত্যাদি নিয়ে পরীক্ষা করা হল। এর পর বেশকিছু ফাংশনাল রিলেশন ও সমীকরণ পাওয়া গেল, যেগুলো দিয়ে আমরা নিখুঁত ভাবে পড়ন্ত বস্তুর সরণ, বেগ, ত্বরণ আগে থেকেই বলে দিতে পারি। যেগুলো আমাদের খুবই পরিচিত।

V=u+at
v²=u²+2as
s=ut+1/2 at²
F=mg ইত্যাদি।

তার মানে আমরা প্রাকৃতিক ঘটনার মাঝে লুকিয়ে থাকা গণিত খুঁজে বের করলাম! এখন দেখা গেল পড়ন্ত বস্তুর জন্য এই সুত্র ৯৮% সত্য হচ্ছে, বাকিটা মিলছে না। আবার পরীক্ষা করা হল, আরও একটা চলক পাওয়া গেল সেটা হচ্ছে ঘর্ষণ বল। সেই বলের সমীকরণ হচ্ছে

F=6πȵrv

এইবার আমরা যদি আগের সূত্রগুলোকে সংশোধন করি, তাহলে আমরা প্রায় ১০০% নির্ভুল ভাবে কোন বস্তুর পতন কে ব্যাখ্যা করতে পারি।

✪ আমরা তো মাঝে মাঝেই ঢিল ছুড়ে থাকি, সেইটা ও কিন্তু এই সুত্র মেনে চলে। পার্থক্যটা কি?

পার্থক্য হচ্ছে আগের ঘটনা টা শুধু একটা সরল রেখা বরাবর ঘটে, সোজা উপর নিচ দিকে। কিন্তু ঢিল ছোঁড়ার বিষয়টা দুই মাত্রার, এটা যেমন ভুমি বরাবর দূরত্ব অতিক্রম করে, তেমনি উপর-নিচ বরাবরও। সেইটার জন্য ও সমীকরণ আছে, একটু আলাদা, তবে আগের গুলো থেকেই পাওয়া যায়, একটু কায়দা করে।

এইটার প্রয়োগ কিভাবে হবে?
বিজ্ঞানীদের কাজ শেষ এখানে।

এইবার শুরু ইঞ্জিনিয়ারের কাজ। আগের সবগুলো পরীক্ষা নিয়ে তুমি পড়াশুনা করলে, সব জেনে ফেললে। তোমার দেশের সেনাবাহিনী যুদ্ধে হেরে যাচ্ছে, তুমি তীর বানাও। এই সুত্র গুলো যদি তুমি বুঝো, তাহলে তুমি উন্নত মানের, দীর্ঘ পাল্লার তীর বানাতে পারো। তীরের দিন শেষ, এবার কামান, বন্দুক এর যুগ। আবার সেই সুত্র। এর পর আসলো রকেট-মিসাইলের যুগ। এখানেও ঠিক একই খেলা। দেখো যে বিষয়টা জানে না, সে কিন্তু আদিম যুগেই পড়ে থাকলো, কামান-বন্দুক ওয়ালারা তিরধনুক ওয়ালাদের নিমিষেই ধ্বংস করে দিল, মিসাইল ওয়ালারা আবার বন্দুকয়ালাদের।

২। তোমরা কি ভেবে দেখেছ, গাছের গুড়ি শুধু গোল প্রস্থচ্ছেদের হয় বা তার কাছাকাছি হয়? পৃথিবী গোলাকার। এমনকি বৃষ্টির ফোটাও গোল হয়। কেন বলত?

এই প্রশ্ন টা পদার্থবিজ্ঞানের আওতায় পড়ে। পদার্থবিজ্ঞান সব কিছুকে শক্তি আর বল নামক দুটি জিনিস দিয়ে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে। আর এর মধ্যে একটা মহাজাগতিক ধ্রুবক খুঁজে পাওয়া যায়, সেটা হচ্ছে পাই (π)। সৃষ্টিকর্তা তার সৃষ্টিগুলো ডিজাইন করার সময় অসাধারণ সব গণিত ব্যবহার করেছেন!

বৃত্তের ক্ষেত্রফল =πr²
গোলকের আয়তন = 4/3 πr³
গোলকের পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল = 4πr²

উপরের উদাহরন থেকে বুঝা যাচ্ছে, বিজ্ঞান বস্তুজগত কে গাণিতিক উপায়ে ব্যাখ্যা করে। তবে ক্যান্সার রোগ এর জন্য কোন সমীকরণ আছে?

জীববিজ্ঞান আর রসায়ন শাস্ত্র একজন আরেকজনের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত, তবে সব বিষয়ে না। রাসায়নিক বিক্রিয়ার ধারণা কিন্তু বিজ্ঞানের একটা অসাধারণ জিনিস। পৃথিবীতে যত পদার্থ আছে, তাদের মধ্যে ক্রিয়া বিক্রিয়া নিয়ে কাজ করাই রসায়নের কাজ। দুইটা পদার্থের অন্তক্রিয়া জানতে হলে অনু পরমাণুর ধারণায় আসতে হয়, মৌলিক বল, মৌলিক কণা নিয়ে কাজ করতে হয়, বিভিন্ন ধরণের শক্তি নিয়ে কাজ করতে হয়। রসায়নে পদার্থবিজ্ঞানের মত এত বেশি গাণিতিক সমীকরণ এর উপর জোর দেয়া হয় না, অনু-পরমানু আর শক্তির ধারণা দিয়েই সব ধরণের পদার্থের আন্তঃ ক্রিয়া ব্যাখ্যা করা যায়। এই অবস্থায় আসতে লক্ষ লক্ষ পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয়েছে, এবং শেষ পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট প্যাটার্ন খুঁজে বের করা সম্ভব হয়েছে। যার কারনেই আমরা বলতে পারি সালফিউরিক এসিড হাতে পড়লে কি হবে বা চিনিতে দিলে কি ঘটনা ঘটবে।

জীববিজ্ঞান জীবন্ত দেহগুলোর কার্যক্রমের প্যাটার্ন খুঁজে বের করে। জীবজগতের অন্তক্রিয়া, শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া ও তার রাসায়নিক ভিত্তি, আন্তপ্রজাতি সম্পর্ক নিয়ে কাজ করে। আর এই জ্ঞান গুলো মানুষের উপকারে কাজে লাগানোর জন্য মেডিকেল সায়েন্স সহ অনেক রকমের শাখা প্রসাখা রয়েছে।
এতক্ষণ আমরা যে বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা করলাম, সেগুলো ল্যাব এ পরীক্ষা করা যায়, সুনির্দিষ্ট প্যাটার্ন অনুসরণ করে যেটা ব্যবহার করে ভবিষ্যদ্বাণী করা যায়। এগুলো হলো Hard Science।

যে বিজ্ঞানের চলক গুলোর মধ্যে সম্পর্ক নির্ণয় করা যা, প্যাটার্ন বের করা যায়, কিন্তু সেটা ল্যাব এ টেস্ট করা সম্ভব না সেটা সামাজিক বিজ্ঞান। সামাজিক বিজ্ঞান আগের পর্যবেক্ষণ থেকে ভবিষ্যৎ অনুমান করতে পারে, কিন্তু সেটা সব সময়ই সঠিক হয় না, এবং সুনির্দিষ্ট ও নির্ভুল কোন গাণিতিক সমীকরণ বের করা সম্ভব না। যেমন ধরো আজ থেকে ১০০ বছর পর মানুষ কেমন পোশাক পড়বে, কেমন খাবার খাবে, সংস্কৃতি কেমন হবে, কেমন ঘরবাড়ি ব্যবহার করবে সেটা আমরা এখন অনুমান করতে পারি, কিন্তু সেটা গাণিতিক ভাবে প্রকাশ করা যাবে না বা অনুমান পুরোপুরি সঠিক ও হবে না।

ধর্ম হল আমাদের সংস্কৃতির অংশ, ভাল মন্দের অনুভূতি ও নীতি নৈতিকতার জন্য মানদণ্ড। বিজ্ঞান নৈতিকতা নিয়ে কাজ করে না, মানুষের ভাল মন্দের অনুভূতি বা সমাজ কেমন হওয়া উচিত সেটা বিজ্ঞানের আলোচনার বিষয় না। ধর্মীয় বিশ্বাস অলৌকিক জগতের সাথে প্রবল ভাবে সম্পর্কিত, অপরদিকে অলৌকিক কোন জিনিস বা বিশ্বাস বিজ্ঞানের আওতা বহির্ভূত। ধর্মকে বিজ্ঞান সম্মত প্রমাণ করার উন্মাদনা তোমাদের কাছে বেশ পরিচিত, কিন্তু বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার ফলাফল গুলো সংশোধন হলে কি ধর্ম সংশোধন করা হবে? না, তখন অন্য একটা ব্যাখ্যা দেয়া হয়। আসলে ধর্ম বিজ্ঞান সম্মত বলার চেষ্টা করার অর্থ হচ্ছে তোমার ধর্মের চাইতে বিজ্ঞানের সত্যের উপর বিশ্বাস বেশি। একটা জিনিস মনে রাখতে হবে, বিজ্ঞান সব জিনিস এখনো ব্যাখ্যা করতে পারে না। তোমার জন্য বিজ্ঞান ভাল থাকার অনেক উপকরণ নিয়ে এসেছে, কিন্তু তাতে জীবনের সব সমস্যা সমাধান হয়ে যায়নি, যেমন ভাবে শুধু গোঁড়া বিশ্বাসী হয়ে উন্নত জীবন যাপন সম্ভব নয়। ধর্ম ও বিজ্ঞানের ক্ষেত্র সম্পূর্ণ আলাদা এবং একে আলাদা থাকতে দেয়াই ভাল।

গোঁড়া ধর্ম বিশ্বাসী সমাজ কোন সময় ই বিজ্ঞানের উন্নয়নে অবদান রাখেনি, কারণ ধর্ম নতুন কথাকে, নতুন মতবাদকে, নতুন ধারণাকে মেনে নিতে পারে না। প্রাচীন ভারতে গণিতের বা দর্শনের যে চর্চা হয়েছে সেটার সাথে হিন্দু ধর্মীয় শাস্ত্রের বাইরে যেতে পারে নি বলেই তারা সমাজের বিরোধিতার মুখে পড়েন নি। মুসলিম সভ্যতার সবচেয়ে বড় বিজ্ঞানীরা যেমন ইবনে সিনা সহ যারা নতুন বৈজ্ঞানিক মতবাদ নিয়ে এসেছিলেন তারাও সমকালিন আলেম গণ কর্তৃক ধর্মত্যাগী উপাধি পেয়েছিলেন। খ্রিস্টীয় ইউরোপ বিজ্ঞানীদের নির্মম ভাবে নির্যাতন করেছে। জিওরদান ব্রুন, গালিলিও, কেপলার সহ অনেক বিজ্ঞানী মৃত্যুদণ্ড সহ অনেক শাস্তির সম্মুখীন হয়েছেন।

মোঃ রকিবুল ইসলাম
যন্ত্রকৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়